জাসদ ৫০+ কর্মী হত্যার দাবিটি ‘দ্য ডেল্টা লেন্স’-এর মিথ্যাচার ও অপপ্রচার

তৎকালীন সরকারি রিপোর্ট (১৯৭৪) অনুযায়ী নিহত ৩ জন। প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী ও লেখক স্বপন দাশগুপ্ত নিহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৫–৬ জন উল্লেখ করেছেন। সমসাময়িক ইত্তেফাক ও পরবর্তী প্রথম আলোর বিশ্লেষণেও অতিরঞ্জিত সংখ্যার প্রমাণ নেই। জাসদ নেতা শাজাহান সিরাজ নিজেই কর্মসূচিকে ভুল সিদ্ধান্ত বলেন। পাশাপাশি মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের বর্ণনায় ঘটনাটি মাঠপর্যায়ের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে উঠে এসেছে।

ফ্যাক্টচেক

রেদওয়ান ইবনে সাইফুল

3/19/20261 মিনিট পড়ুন

দাবি: ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ৫০ জনের বেশি জাসদ কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। পোষ্ট লিংক ১, নিউজ লিংক

ঘটনার প্রেক্ষাপটঃ

সম্প্রতি ‘দ্য ডেল্টা লেন্স’ নামক একটি অখ্যাত অনলাইন পোর্টাল থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ জাসদের মিছিলে গুলি চালিয়ে ৫০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং এতে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি ভূমিকা ছিল। তবে ঐতিহাসিক নথি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করে না।

অনুসন্ধান ও সত্যতা যাচাইঃ

১. নিহতের প্রকৃত সংখ্যা বনাম রাজনৈতিক অতিরঞ্জন: ১৭ মার্চের সেই দুঃখজনক ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও তা কোনোভাবেই ‘৫০ জন’ নয়।

  • সরকারি তথ্য: তৎকালীন সরকার সে সময় ৩ জন নিহতের কথা স্বীকার করে।

  • প্রত্যক্ষদর্শী ও সাংবাদিক: প্রবীণ সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী, যিনি স্বয়ং ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, তাঁর মতে নিহতের সংখ্যা ৫ থেকে ৬ জনের বেশি ছিল না। লেখক স্বপন দাশগুপ্তও তাঁর বইয়ে নিহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৬ জন বলে উল্লেখ করেছেন।

  • গণমাধ্যম: তৎকালীন পত্রিকা ইত্তেফাক এবং সমসাময়িক গবেষণায় প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা কোনোভাবেই অতিরঞ্জিত দাবির ধারেকাছে ছিল না।

২. ঘটনার সূত্রপাত ও উস্কানি: জাসদের সেই কর্মসূচিটি ছিল তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম. মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও। মিছিলে থাকা উগ্র কিছু অংশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে চড়াও হয় এবং গেটে আগুন ধরিয়ে দেয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের জানমাল রক্ষায় সেখানে দায়িত্বরত নিরাপত্তা বাহিনী (পুলিশ, রক্ষীবাহিনী ও বিডিআর) গুলি চালাতে বাধ্য হয়। এটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল না, বরং ছিল তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা জনিত প্রতিক্রিয়া।

৩. জাসদের নিজস্ব স্বীকারোক্তি: ঘটনার পরবর্তী সময়ে খোদ জাসদ নেতা শাজাহান সিরাজ একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন, যেখানে তিনি নিজেই স্বীকার করেন যে, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও কর্মসূচি জাসদের একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।” অর্থাৎ, কর্মসূচির সহিংস মোড় নেওয়ার দায়ভার সংগঠনের হঠকারী সিদ্ধান্তের ওপরই বর্তায়।

৪. বঙ্গবন্ধুর সংশ্লিষ্টতা যাচাই: ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, জাসদের এই হামলা ছিল আকস্মিক। তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান এবং লেখক মহিউদ্দিন আহমদের বর্ণনা মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে উপস্থিত ডিআইজি আব্দুর রকিব খন্দকার শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। গুলি চালানোর সিদ্ধান্তটি ছিল ফিল্ড লেভেলে থাকা কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর এই ঘটনার সাথে তাৎক্ষণিক কোনো সংশ্লিষ্টতা বা পূর্বানুমতি প্রদানের সুযোগ ছিল না।

আরো বিস্তারিতঃ প্রথম আলোর রিপোর্ট।

‘দ্য ডেল্টা লেন্স’ বা এই জাতীয় পোর্টালগুলো যে ‘৫০ জন নিহত’ হওয়ার দাবি করছে, তা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য একটি ভিত্তিহীন সংখ্যাতত্ত্ব। ঐতিহাসিক তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং খোদ জাসদ নেতাদের পরবর্তী মূল্যায়ন প্রমাণ করে যে, এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ ছিল যেখানে নিহতের সংখ্যা অতিরঞ্জিত করে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকে এই ঘটনায় খুনি হিসেবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।