বাংলাদেশ বা শেখ হাসিনা ইস্যুতে একাত্তর টিভির ফটোকার্ডে উদ্ধৃত বক্তব্য মাইকেল কুগেলম্যানের নয়, এটি অপপ্রচার
সার্চ ইঞ্জিন, মাইকেল কুগেলম্যানের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার, তাঁর অফিসিয়াল এক্স (X) অ্যাকাউন্ট এবং বাংলাদেশবিষয়ক সাম্প্রতিক মন্তব্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক এনডিটিভি সাক্ষাৎকারের পর একাত্তর টিভির ফটোকার্ডে উদ্ধৃত বক্তব্যের মতো কোনো মন্তব্য তিনি করেননি। এছাড়া কুগেলম্যানের সাম্প্রতিক প্রকাশিত নিবন্ধ, গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমেও শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বা তাঁর বাকী জীবন কারাগারে কাটানোর সম্ভাবনা নিয়ে এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফ্যাক্টচেক
রেদওয়ান ইবনে সাইফুল
6/29/20261 মিনিট পড়ুন


শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে এনডিটিভিতে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারের পর একাত্তর টিভির একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
একাত্তর টিভি একটি ফটোকার্ড প্রচার করে দাবী করেঃ
শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরবেন—এটা আমি কল্পনাও করতে পারি না। যদি তিনি ফেরেন, তাহলে তাকে বাকী জীবন কারাগারে কাটাতে হতে পারে। ভারত চাইবে তিনি তৃতীয় কোনো দেশে যান, কিন্তু মনে হচ্ছে তাকে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক এমন কোনো তৃতীয় দেশ নেই।
— মাইকেল কুগেলম্যান
পোষ্ট লিংক এখানে।
পোষ্টটি চার হাজার বার শেয়ার করা হয় এবং ১ লক্ষ ১৫ হাজার রিএক্ট পড়ে সাথে প্রায় নয় হাজার কমেন্ট পড়ে। উক্ত ফটোকার্ডে কোন তথ্যসূত্র প্রকাশ করেনি একাত্তর টিভি।
অনুসন্ধানঃ দাবির সত্যতা যাচাই করতে চেক পয়েন্ট বাংলাদেশ সংক্রান্ত মাইকেল কুগেলম্যানের
বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার যাচাই করে । চেক পয়েন্ট গুগল সার্চ ইঞ্জিনে কি ওয়ার্ড সার্চ করে এবং কুগেলম্যানের সাম্প্রতিক বক্তব্য পাওয়া যায় শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগকে নিয়ে। ২৮ জুন প্রকাশিত একাত্তর টিভিতে ইংরেজিতে তার ৪৮ সেকেন্ডের একটি সাক্ষাৎকার পাওয়া গিয়েছে।
দশ ঘন্টা আগে আপ্লোড হওয়া একাত্তর টিভিতে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন "I cannot imagine Sheikh Hasina returning to Bangladesh this year. I mean, that seems hard to believe; I cannot imagine it. I mean, not just for security reasons, but for legal reasons. Does she want to spend the rest of her life in jail? I suspect that she would be arrested if she came back. And I don't think that India—I think India has had a conundrum. India, I think, would much prefer that she not be in India. I think India would prefer that she find a third country to go to, but that hasn't panned out. But I think if there were going to be a third country, that third country would have been identified some time ago. I think that when she said that she intends—her plans or hopes—to come back to Bangladesh this year, that's just nonsense. I cannot imagine that happening."
যার বাংলা অনুবাদ করলে দাড়ায়ঃ "আমি এ বছর শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফিরে আসার বিষয়টি কল্পনাও করতে পারছি না। আসলে, বিষয়টি বিশ্বাস করা কঠিন; আমি তা ভাবতেই পারছি না। শুধু নিরাপত্তার কারণেই নয়, বরং আইনি কারণেও এটি অসম্ভব মনে হয়। তিনি কি তাঁর বাকি জীবনটা কারাগারে কাটাতে চান? আমার ধারণা, ফিরে এলেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। আর আমার মনে হয় না যে ভারত—আসলে ভারতের জন্যও বিষয়টি একটি উভয়সংকট। ভারত সম্ভবত চাইবে না যে তিনি তাদের দেশে অবস্থান করুন। ভারত হয়তো চাইত তিনি অন্য কোনো তৃতীয় দেশে চলে যান, কিন্তু বাস্তবে তা আর হয়ে ওঠেনি। তবে আমার মনে হয়, যদি কোনো তৃতীয় দেশের ব্যবস্থা হওয়ারই থাকত, তবে তা অনেক আগেই ঠিক হয়ে যেত। তিনি যখন বলেন যে এ বছর বাংলাদেশে ফিরে আসার ইচ্ছা বা পরিকল্পনা তাঁর আছে, তখন আমার কাছে তা নিছক অবাস্তব কথা বলেই মনে হয়। এমনটা ঘটার কথা আমি কল্পনাও করতে পারি না।"
অর্থাৎ ফটোকার্ডে থাকা উদ্ধৃতির সাথে প্রকৃত বক্তব্যের কোন মিল নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যাচাইঃ
কুগেলম্যানের অফিসিয়াল এক্স (Twitter) অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তার সর্বশেষ কার্যক্রম ছিল ২৬ জুন, যেখানে তিনি ভারত–পাকিস্তান সম্পর্কিত একটি বিশ্লেষণ শেয়ার করেন। সেখানে শেখ হাসিনা বা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো মন্তব্য নেই।
এছাড়া শেখ হাসিনার এনডিটিভি সাক্ষাৎকার প্রকাশের সময়কাল (২৮ জুন) এবং কুগেলম্যানের অনলাইন কার্যক্রমের মধ্যে কোনো মিল পাওয়া যায় না, যা ফটোকার্ডে উদ্ধৃত বক্তব্যের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করে। বরং গত এক সপ্তাহে তিনি মূলত ভারত–পাকিস্তান ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশ বিষয়ক কোনো নতুন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রাসঙ্গিক পূর্ববর্তী বক্তব্যঃ
উল্লেখযোগ্যভাবে, ১৭ নভেম্বর প্রকাশিত আটলান্টিক কাউন্সিলের একটি ব্লগ রিপোর্টে কুগেলম্যান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। সেখানে তিনি লেখেনঃ
For New Delhi, the middle ground option is best: Work out an arrangement where Hasina can be relocated to a third country—likely an authoritarian state where her security would be ensured and access to her could be controlled. There’s been ample speculation since Hasina’s ouster about where she could end up, from Belarus to somewhere in the Gulf. But the question is if there will be any takers for such a high-maintenance charge. Hasina may be a special guest of New Delhi’s, but she may now be wearing out her welcome—especially with India looking to explore opportunities for rapprochement with Dhaka as the Bangladesh election draws closer.
তবে মাইকেল কুগেলম্যান এই বক্তব্যের সাথে একাত্তর টিভির প্রকাশিত বক্তব্যের কোন মিল নেই।
আটলান্টিক কাউন্সিলের মাইকেল কুগেলম্যান এর বক্তব্যের অনুবাদঃ
নয়াদিল্লির জন্য মধ্যপন্থা অবলম্বন করাই শ্রেয়: এমন একটি ব্যবস্থা করা যাতে হাসিনাকে তৃতীয় কোনো দেশে—সম্ভবত এমন কোনো কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে—স্থানান্তর করা যায়, যেখানে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং তাঁর সাথে যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই হাসিনাকে কোথায় আশ্রয় দেওয়া হতে পারে—বেলারুশ থেকে শুরু করে উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশ—তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। তবে প্রশ্ন হলো, এমন একজন ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়ার মতো দায়িত্ব বা ঝুঁকি কেউ নিতে চাইবে কি না, যা বেশ জটিল ও স্পর্শকাতর হতে পারে। হাসিনা হয়তো নয়াদিল্লির একজন বিশেষ অতিথি, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি এখন হয়তো কিছুটা অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে—বিশেষ করে যখন বাংলাদেশের নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে এবং ভারত ঢাকার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের বা সমঝোতার সুযোগ খুঁজছে।
এই বক্তব্যে তিনি মূলত ভারতের কৌশলগত অবস্থান ও সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন, তবে এখানে একাত্তর টিভির ফটোকার্ডে উদ্ধৃত মন্তব্যের কোনো মিল নেই।এর বাংলা অনুবাদ অনুযায়ী, তিনি বলেন যে শেখ হাসিনাকে তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের বিষয়ে বিভিন্ন জল্পনা থাকলেও বাস্তবে কোনো গ্রহণযোগ্য পক্ষ পাওয়া কঠিন হতে পারে—এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী পর্যবেক্ষণ, কোনো সরাসরি মন্তব্য নয়।
অর্থাৎ একাত্তর টিভির ফেসবুক পাতায় প্রকাশিত উক্তি সম্পূর্ণ মিথ্যাচার এবং তথ্য বিকৃতি।
এছাড়া ১৪ আগস্ট ২০২৪ এ মাইকেল কুগেলম্যান ডেইলি স্টারের সাথে একটি সাক্ষাৎকার দেন , সেখানেও বংলাদেশ ইস্যুতে বক্তবও রাখেন। সেখানে তিনি বলেন It's quite simple: Hasina's security forces resorted to egregious levels of violence against peaceful protestors, robbing Hasina of her legitimacy—which was already fragile due to growing economic stress and yet another questionable election—and prompting the nation to rally around the protestors. Those repressive actions from the security forces also unleashed pent up public grievances against the state. The genie was let out of the bottle, and eventually there was nothing else that Hasina or the Awami League could do, other than step down.
অনুবাদঃ বিষয়টি বেশ সহজ: শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হাসিনার নিরাপত্তা বাহিনী চরম মাত্রার সহিংসতা চালিয়েছিল। এর ফলে হাসিনা তাঁর বৈধতা হারান—যে বৈধতা ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ এবং আরও একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের কারণে আগেই নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল—এবং জাতি বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা বাহিনীর ওই দমনমূলক পদক্ষেপগুলো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকেও উসকে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করা ছাড়া হাসিনা বা আওয়ামী লীগের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
এই বক্তব্যে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক সহিংসতা ও ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেছেন, তবে এখানে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কোনো মন্তব্য নেই।
অর্থাৎ গুগলে কি ওয়ার্ড সার্চ , একাত্তর টিভিতে প্রকাশিত বক্তব্য এবং মাইকেল কুগেলম্যানের বাক্তিগত এক্স প্রোফাইল কিংবা পূর্বের সংবাদ পর্যালোচনা করে দেখা যায় কুগেলম্যান ফটোকার্ডে উদ্ধৃত বক্তব্য দেননি। বরং এটি একাত্তর টিভির মনগড়া ভাষ্য এবং অপপ্রচার। একাত্তর টিভির ফটোকার্ডে প্রচারিত বক্তব্যটি যাচাইযোগ্য উৎসবিহীন এবং কুগেলম্যানের প্রকৃত বক্তব্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই এটি বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপতথ্য হিসেবে প্রতীয়মান।
