রাজনৈতিক নেতাদের ছবি সম্বলিত নতুন ব্যাংক নোট প্রচলনের দাবি ভূঁয়া
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া জিয়াউর রহমান বা খালেদা জিয়ার ছবিযুক্ত ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটগুলো ভুয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইস্যু করা হয়নি। ছড়িয়ে পড়া এই নোটগুলোতে সিরিয়াল নম্বর, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য, গভর্নরের স্বাক্ষর এবং বানানে অসংখ্য অসংগতি ও ভুল পাওয়া গেছে। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের স্বাক্ষরিত বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছবি সংবলিত কোনো নতুন নোট জারির সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্রহণ করেনি।
ফ্যাক্টচেক
আরিফ মনোয়ার
3/14/20261 মিনিট পড়ুন


দাবিঃ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে ৫০০ ও ১০০০ টাকার ব্যাংক নোট ইস্যু করেছে, যেখানে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে।
কিছু পোস্টে আবার ৬০০ টাকা মূল্যমানের নতুন ব্যাংক নোট প্রচলনের দাবিও করা হচ্ছে।
দাবির সূত্রপাতঃ
সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকের বিভিন্ন পেইজ, গ্রুপ ও ব্যাক্তিগত আ্যকাউন্ট থেকে নতুন ব্যাংক নোটের দাবি করে কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। এসব ছবিতে ৫০০, ১০০০ এবং ৬০০ টাকা মূল্যমানের নোটের ডিজাইন প্রদর্শন করা হয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোর মধ্যে ১০০০ টাকার একটি নোটে নীলচে-কালো রঙের ডিজাইন দেখা যায়, যেখানে একপাশে তারেক রহমানের ছবি এবং অন্য পাশে ধানের শীষ ও জাতীয় স্মৃতিসৌধের ছবি যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে ৫০০ টাকার কিছু নোটে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে বলে দেখা যায়।
অনুসন্ধানঃ
দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য ও প্রচলিত ব্যাংক নোটের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোর তুলনা করা হয়। প্রথমত, আলোচিত ১০০০ টাকার নোটের সিরিয়াল নম্বর হিসেবে ‘হ . ল ১০০৫০৭৮’ লেখা দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নোটে ৭ ডিজিটের ক্রমিক নম্বরের আগে দুটি বাংলা বর্ণ থাকলেও এভাবে বর্ণের মাঝে ডট (.) ব্যবহারের কোনো নজির নেই।
দ্বিতীয়ত, ৫০০ টাকার একটি নোটে জিয়াউর রহমানের ছবি এবং মাঝখানে কৃষক-কৃষাণীদের কাজ করার ছবি যুক্ত করা হয়েছে। অথচ সাধারণত এই স্থানে নোটের মূল্যমান, নিশ্চয়তা বাক্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের স্বাক্ষর থাকে—যা আলোচিত নোটে অনুপস্থিত। এছাড়া একই নোটে বাংলা ও ইংরেজি ক্রমিক নম্বর একে অপরের সঙ্গে মিলেও না।
আরেকটি ৫০০ টাকার নোটে বাম পাশে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং ডান পাশে খালেদা জিয়ার ছবি দেখা যায়। যদিও এটি সাম্প্রতিক ৫০০ টাকার নোটের ডিজাইনের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ, তবে এর বিন্যাস ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য প্রচলিত নোটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো একটি ৬০০ টাকার নোটেও একাধিক অসংগতি দেখা যায়। এতে ভুল বানানে ‘ছিয়শত টাকা’ লেখা রয়েছে এবং নোটে ব্যবহৃত ক্রমিক নম্বরের আগে কোনো বাংলা বর্ণ নেই, যা বাংলাদেশি ব্যাংক নোটের প্রচলিত নিয়মের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যাংক নোটগুলোতে সাধারণত লেখা থাকে “চাহিবামাত্র ইহার বাহককে … টাকা দিতে বাধ্য থাকিবে” এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের স্বাক্ষর থাকে। কিন্তু আলোচিত নোটগুলোর কয়েকটিতে এই নিশ্চয়তা বাক্য অসম্পূর্ণ বা ভুল বানানে লেখা রয়েছে, আবার কোথাও স্বাক্ষর অনুপস্থিত।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান হাবিব মনসুর–এর স্বাক্ষরযুক্ত ১০০০, ৫০০, ১০০, ৫০, ২০ ও ১০ টাকার নোট বাজারে প্রচলিত রয়েছে। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও এখন পর্যন্ত তার স্বাক্ষরযুক্ত কোনো নতুন ব্যাংক নোট জারির ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নতুন ডিজাইনের কয়েকটি ব্যাংক নোট চালু করা হলেও সেখানে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছবি ব্যবহার করা হয়। আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছবি যুক্ত কোনো নোট তখনও প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সরকারের পক্ষ থেকেও এমন কোনো নতুন নোট চালুর সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
অতএব, দাবিটি মিথ্যা। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০০, ১০০০ বা ৬০০ টাকা মূল্যমানের এমন কোনো নতুন ব্যাংক নোট জারি করেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নোটের ছবিগুলোতে একাধিক নকশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অসংগতি রয়েছে, যা থেকে ধারণা করা যায় এগুলো প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি করা হয়েছে। ফলে এসব পোস্টে করা দাবিগুলো ভিত্তিহীন।
