গণপিটুনিতে আহত হয়ে যুদ্ধাপরাধে জড়িত সংগঠন ছাত্রসংঘের নেতা মালেক মৃত্যুবরণ করে
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেক ঢাবি শিক্ষার্থীদের গণপিটুনিতে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। ছাত্রসংঘের যাদের সাথে তৎকালে সংঘর্ষ হয়েছিল তারা কেউ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তোফায়েল আহমেদ আব্দুল মালেকের হত্যার সাথে কোন ভাবেই সংশ্লিষ্ট নন, বরং ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ সাক্ষ্য দেয় আবদুল মালেক যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাল্টা গণপিটুনির শিকার তখন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমদেদ টি এস সি অডিটোরিয়ামে সভা পরিচালনা করছিলেন।
ফ্যাক্টচেক
আশালতা বৈদ্য
6/2/20261 মিনিট পড়ুন


মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ৬৯ এর গণ অভ্যুথানের নেতা তোফায়েল আহমেদ গত ১ জুন ২০২৬ এ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে জামায়াত-ছাত্রশিবির নিয়ন্ত্রিত পেজ গুলো সমন্বিত অপতথ্য ছড়ানো শুরু হয় এবং তোফায়েল আহমেদকে হত্যাকারী হিসেবে দেখানো হয়।
দাবির সূত্রপাতঃ তফায়েল আহমেদের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে DU Insider থেকে দাবি করা হয় ‘’ঢাবি শিক্ষার্থী মালেকের হত্যাকারী আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন। ‘’ এই পোষ্ট ৩৪৪ বার শেয়ার হয় এবং প্রায় ৭ হাজার রিয়েক্ট কমেন্ট হয়।পরবর্তীতে ছাত্রশিবির সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেজ এবং প্রোফাইল থেকে একই দাবী করা হয়। জামায়তের সোশ্যাল মিডিয়া সেলের Just Habib ও একই ধরণের পোষ্ট করে যেটি প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বার শেয়ার হয় এবং ৫ লক্ষ বার দেখা হয়েছে। পোষ্টগুলো দেখুন এখানে লিংক ১, লিংক ২।
অনুসন্ধানঃ দাবির সত্যতা যাচাই করতে চেক পয়েন্ট ছাত্র সংঘের নেতা মালেক নিহত সংক্রান্ত তৎকালীন সংবাদ পত্রের তথ্য যাচাই করে।
১৯৬৯ সালের ১৩ আগস্ট প্রকাশিত আজাদ পত্রিকা এ ঘটনার বিবরণে লিখেছে:
'গতকাল সকাল ১১ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে খসড়া শিক্ষানীতি সম্পর্কে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
ডাকসুর সহ-সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সভা শুরু হয়।
সভার প্রথম বক্তা জনাব শামসুদ্দোহা নয়া শিক্ষানীতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দান করিতে থাকিলে এক পর্যায়ে কিছু সংখ্যক ছাত্র (মালেক ও ছাত্র সংঘের নেতারা) একযোগে দাঁড়াইয়া পড়ে এবং বিভিন্ন ধ্বনি করিয়া বক্তার মতামতের প্রতিবাদ জানায়। এই সময় সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমেদ সকলের প্রতি শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং প্রতিবাদমুখর ছাত্রদেরও বক্তব্য পেশ করার সুযোগ দানের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু গোলযোগ ক্রমেই বাড়িতে থাকে এবং এল পর্যায়ে কিছু সংখ্যক ছাত্র (মালেক ও ছাত্র সংঘের নেতারা) দৌড়াইয়া মঞ্চে আরোহণ করিয়া মঞ্চের টেবিল চেয়ার তচনচ করিয়া দেয়।
সেমিনারে উপস্থিত দর্শকগণ এই সময় দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া এদিক ওদিক ছুটাছুটি করিতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে হলের মধ্যে বেদম চেয়ার ছোড়াছুড়ি শুরু হয় এবং একইভাবে প্রায় আধাঘন্টা গোলযোগ চলার পর উভয়পক্ষই হলত্যাগ করিয়া বাহিরে চলিয়া আসে। এই সময় হলের সমস্ত চেয়ার-টেবিল লণ্ড ভণ্ড অবস্থায় দেখা যায়। কয়েকটি চেয়ারে রক্তের দাগও লক্ষ্য করা যায়। এই চেয়ার নিক্ষেপের মধ্যে ঢাকায় জনৈক সাংবাদিক এবং একজন ছাত্রীও সামান্য আহত হন।
এদিকে প্রতিবাদমুখর ছাত্ররা (মালেক ও ছাত্র সংঘের নেতারা) আবার বাহিরে আসিয়া চেয়ারের হাতল, ভাংগা কাঠ প্রভৃতিতে সজ্জিত হইয়া আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে এবং দ্বিতীয় বর্ষ রাজনীতির ছাত্র সুলতানের মাথা ফাটাইয়া দেয়। এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে অপর দল হাতের কাছে প্রাপ্ত হাতিয়ার লইয়া প্রতিবাদকারী ছাত্রদের ওপর ঝাপাইয়া পড়ে এবং তাহাদের অনেককে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মধ্যে ধরাশায়ী করিয়া ফেলে। এই পর্যায়ে প্রতিবাদকারী দল (মালেক ও ছাত্র সংঘের নেতারা) উর্ধশ্বাসে রেসকোর্স ময়দানের দিকে দৌড়াইতে থাকিলে অপরপক্ষ তাহাদের তাড়াইয়া লইয়া যায় এবং অনেককে রেসকোর্স ময়দানে প্রহার করিয়া ধরাশায়ী করে। প্রতিবাদকারী ছাত্ররা (মালেক ও ছাত্র সংঘের নেতারা) আত্মরক্ষার্থে রেসকোর্সের দিকে দৌড়াইবার সময়ও অনেকের মাথায় ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের চেয়ার পরিলক্ষিত হয়।
প্রতিবাদমুখর ছাত্ররা পলায়ন করিলে জনাব তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে আবার আলোচনা সভা শুরু হয়।
এই পর্যায়ে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনার পর প্রস্তাব পাশ করিয়া সভার সমাপ্তি ঘটে। ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের এই গোলযোগে আহত হইয়া যে ৬ জন ছাত্র হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছেন তাহারা হইতেছেনঃ (১) জনাব আব্দুল মালেক, (২) জনাব আব্দুর রব, (৩) জনাব নাসিরুল ইসলাম, (৪) জনাব শামসুল হুদা, (৫) জনাব মোঃ ইদ্রিস ও জনাব মোঃ ইসমাইল। ইহাদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তির অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক বলিয়া জানা গিয়েছে। অন্যান্যদের অবস্থা উন্নতির দিকে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল হইতে আরও ১০ ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছাড়িয়া দেওয়া হয়। ইহা ছাড়াও একজন ছাত্রসহ অন্যুন ৩৪/৩৫ ব্যক্তি কমবেশী আহত হয়।'
উল্লিখিত সংঘর্ষে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ দিন পরে, অর্থাৎ ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্ট আব্দুল মালেক মারা যায়।
আব্দুল মালেকের মৃত্যুর পর ডাকসুর পক্ষ থেকে তোফায়েল আহমেদ, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং পৃথকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শোকাবার্তা জানান। ১৯৬৯ সালের ১৭ আগস্ট আজাদ পত্রিকার একটি সংবাদের শিরোনাম ছিলো— আবদুল মালেকের মৃত্যুতে সর্ব্বত্র শোকের ছায়া। সুত্রঃ আরিফ ইশতিয়াকের ফেসবুক পোস্ট।
সাংবাদিক আহমেদ ইশতিয়াক তার ফেসবুক পোষ্টে লিখেছেন ‘’ মালেক কিন্তু ছাত্রলীগের হামলায় মারা যায়নি। মূলত মারা গিয়েছিল ইসলামি ছাত্র সংঘের সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের পাল্টাপাল্টি হামলায়। তবে সেটিও কখনোই কোন সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিলোনা। ছাত্র সংঘের সঙ্গে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যে ছাত্র ইউনিয়নের সংঘর্ষ হয়েছিল সেই সংঘর্ষে ছাত্র ইউনিয়নের ৩ জন নেতা, ছাত্রলীগের ২ জন এবং শিবিরের একজন আহত হয়। পরে হামলার ঘটনায় মালেকের উপর হামলা চালানো হলে সে মারা যায়। তৎকালীন সময়েও ইসলামি ছাত্র সংঘ তোফায়েল আহমেদ তো দূরের কথা ছাত্রলীগকেও অভিযুক্ত করেনি। তারা অভিযুক্ত করেছিলো সমাজতন্ত্রী ছাত্র সংগঠনকে।
আব্দুল মালেক নিহত হওয়ার ঘটনায় বঙ্গবন্ধু এবং ডাকসুর পাশাপাশি ছাত্রলীগও শোক প্রকাশ করেছিল। বলাবাহুল্য তখন ডাকসুর ভিপি ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।
ঘটনার প্রথম দিকে আব্দুল মালেক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ছাত্র লীগের কোন সংশ্লিষ্টতাই দেখায়নি ইসলামি ছাত্র সংঘ। অন্যদিকে আব্দুল মালেক নিহত হওয়ার ঘটনায় ইসলামি ছাত্র সংঘ যে ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল সেই ১০ জনের মধ্যে কেউই কোন ছাত্র সংগঠনের পদধারী নেতা ছিলোনা। সবাই ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী।
অর্থাৎ তৎকালে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এটি পরিস্কার তোফায়েল আহমেদ কিংবা ছাত্রলীগের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের গণপিটুনিতে মারা যাওয়ার ঘটনায়।
এছাড়া ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায় যে ডাকসুর তৎকালীন ভিপি তোফায়েল আহমেদ কোনভাবেই জড়িত নয় তা একাত্তরে বুদ্ধিজীবি হত্যার মূল হোতা যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মুঈনুদ্দীন সরাসরিই স্বীকার করেছেন।যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের ভাষ্যে ‘ তোফায়েল আহমেদ মালেকের হত্যাকারী নয়’’। ভিডিও টি দেখুনঃ লিংক।
অতএব, তোফায়েল আহমেদ আব্দুল মালেকের হত্যার সাথে কোন ভাবেই সংশ্লিষ্ট নন, বরং ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ সাক্ষ্য দেয় আবদুল মালেক যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাল্টা গণপিটুনির শিকার তখন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমদেদ টি এস সি অডিটোরিয়ামে সভা পরিচালনা করছিলেন।
অর্থাৎ, যুদ্ধাপরাধী সংগঠন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেক শিক্ষার্থীদের গনপিটুনিতে মারা যান , যাদের সাথে তৎকালে সংঘর্ষ হয়েছিল ছাত্র সংঘের তারা কেউ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। এই ঘটনার সাথে তোফায়েল আহমেদের কোন যোগসূত্র নেই।
